Saturday, August 3, 2024

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে মেয়ে নেটওয়ার্কের বক্তব্য

মেয়ে নেটওয়ার্ক বাংলাভাষী নারীদের একটি তৃণমূল নারীবাদী সংগঠন। আমাদের সাত হাজারেরও বেশি সদস্য বর্তমানে বাংলাদেশে এবং বাংলাদেশের বাইরে বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছেন। আমরা লিঙ্গসমতা ও সার্বজনীন সাম্য অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে ২০১১ সাল থেকে বাংলাদেশে নিরবিচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের সাংগঠনিক মূলমন্ত্র নারীবাদী চিন্তা এবং নারীবাদী আন্দোলনের সুদীর্ঘ যাত্রা দ্বারা অনুপ্রাণিত। আমরা বিশ্বাস করি নারীবাদ শুধু পুরুষের সাথে নারীর সমতা অর্জনের মাধ্যম নয়। সকল ধরনের বৈষম্য থেকে, সকল নিপীড়নমূলক ব্যবস্থা ও প্রতিষ্ঠান থেকে সকল মানুষের সার্বিক মুক্তি আমাদের নারীবাদের লক্ষ্য। রাষ্ট্র যখন নিপীড়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, আমাদের নারীবাদ আমাদেরকে অনুপ্রাণিত করে এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে, এর কঠোর সমালোচনা করতে। 


মেয়ে নেটওয়ার্কের তরফ থেকে আমরা সর্বস্তরের নারীবাদীদের কাছে চলমান বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে মতামত আহ্বান করেছিলাম। সকল বক্তব্যের আলোকে আমরা গত দুই সপ্তাহব্যাপী বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের ন্যায্য আন্দোলনের উপর রাষ্ট্রযন্ত্রের জোর-জুলুম-হত্যা-নিপীড়নের তীব্র প্রতিবাদ জানাই। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে শান্তিপূর্ণ মতপ্রকাশের অপরাধে এমন নজিরবিহীন হত্যা, গ্রেপ্তার ও নিপীড়নের কোনো জায়গা থাকতে পারে না। আমরা মনে করি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন কোটা সংস্কারের দাবি নিয়ে শুরু হলেও এর প্রতি ব্যাপক গণসমর্থন শুধু কোটার কারণে হয়নি। এই আন্দোলন বহু বছরের জবাবদিহিতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অভাব এবং রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক অচলাবস্থার প্রতি গণমানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ।


আমরা বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের ২১শে জুলাইয়ের রায়ের ব্যাপারেও উদ্বিগ্ন। এই রায়ে নারী কোটা সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত করা হয়েছে এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের জন্য বরাদ্দ কোটা পাঁচ শতাংশ থেকে কমিয়ে এক শতাংশ করা হয়েছে। সুপ্রীম কোর্টের আপিল বিভাগের রায়ে প্রতিবন্ধী এবং তৃতীয় লিঙ্গকে এক কাতারে ফেলে তাদের জন্য এক শতাংশ কোটা বরাদ্দ করা হয়েছে। এসব সিদ্ধান্তের সমালোচনা, পর্যালোচনা এবং এর দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল ও প্রয়োজনীয় নতুন পলিসি নিয়ে বিশদ আলোচনার আবশ্যকতা রয়েছে বলে আমাদের বিশ্বাস। সেই আলোচনায় পৌঁছানোর আগে বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আনা, মতপ্রকাশের অধিকার নিশ্চিত করা এবং জনসংহতি গঠন করাকে আমরা জরুরি মনে করছি। 

 

একটি নারীবাদী সংগঠন হিসেবে আমরা বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় এবং প্রাতিষ্ঠানিক নিপীড়ন থেকে জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গোষ্ঠী নির্বিশেষে গণমানুষের মুক্তি চাই। আমরা রাষ্ট্রযন্ত্রকে জনগণের কাছে দায়বদ্ধ হিসেবে দেখতে চাই। আমরা রাষ্ট্রের জবাবদিহিতা চাই, সুবিচার চাই। আমরা শক্তিশালী রাজনৈতিক দল ও ব্যবসায়ীদের প্রভাব থেকে মুক্ত স্বাধীন মিডিয়া চাই। আমরা নির্ভয়ে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা চাই, জীবনের নিরাপত্তা চাই, মর্যাদার নিশ্চয়তা চাই। আমরা চাই একটি সৎ, মানবিক, সুবিবেচনামূলক সরকার যা দুর্নীতিমুক্ত ও গণবান্ধব রাষ্ট্রের নিশ্চয়তা দিতে পারে, যা সকল প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে বদ্ধপরিকর, সর্বসাধারণের কাছে যেই সরকার দায়বদ্ধ, যেই সরকার গণমানুষকে সকল সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে ধারণ করে। আমরা আমাদের নারীবাদী অবস্থান থেকে একটি সার্বজনীন ভবিষ্যতের প্রত্যাশায় রাষ্ট্রের সার্বিক ও দীর্ঘমেয়াদী পুনর্গঠন দাবি করছি। 

পুনশ্চ: ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, তৃতীয় লিঙ্গ ইত্যাদি শব্দ এখানে সুপ্রীম কোর্টের রায় অনুযায়ী ব্যবহৃত হয়েছে। আমাদের স্বপ্নের ভবিষ্যৎ সমাজ সমতলের, পাহাড়ের, বাঙালির, আদিবাসীর, সকল লিঙ্গ-পরিচয়ের মানুষের জন্য, সব ধরনের বৈচিত্র্যময় সত্ত্বার জন্য সমান। সেখানে কেউ প্রথম নয়, কেউ দ্বিতীয় নয়, কেউ তৃতীয় নয়, কেউ ক্ষুদ্র নয়, কেউ বৃহৎ নয়।

যারা এই বক্তব্য গঠনে যোগদান করেছেন এবং সামনেও যারা মতামত যোগ করতে চান তাদেরকে ধন্যবাদ ও সাদর আমন্ত্রণ। আপনারা আপনাদের মতামত পাঠাতে পারেন এখানে মন্তব্য যোগ করে, মেয়ে নেটওয়ার্কের ফেসবুক পেইজে মেসেজ দিয়ে এবং meyenetwork@gmail.com বরাবর ইমেইলের মাধ্যমে।